বাংলাদেশ গুরুকুলের প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা সুফি ফারুক ইবনে আবুবকরের বাণী

হাজার বছরের নদীবাহিত পলি, উর্বর মাটির প্রাচুর্য আর বীরত্বগাথার ইতিহাস লালন করে গড়ে উঠেছে সোনার বাংলা। বঙ্গাব্দের সুপ্রাচীন জনপদ, প্রাক-ঔপনিবেশিক সমৃদ্ধি, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, ৪৭-এর দেশভাগ, ৫২-এর রক্তঝরা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ কেবল একটি ভূখণ্ড নয়; এটি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়, অদম্য অস্তিত্ব ও পরম আত্মত্যাগের অমর ইতিহাস। নদী, প্রকৃতি, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও মুক্তিকামী মানুষের রক্ত দিয়ে আঁকা এই মানচিত্র হাজার বছরের লড়াইয়ের এক অসামান্য ফসল।
আমার কাছে ‘বাংলাদেশ বিদ্যা’ বা দেশভাবনা কেবল কিছু তারিখ, ঐতিহাসিক ঘটনার তালিকা বা পাঠ্যপুস্তকের ইতিহাস মুখস্থ করার বিষয় নয়। বাংলাদেশ হলো ইতিহাস, ঐতিহ্য, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, সমাজবিজ্ঞান, ভূ-রাজনীতি এবং হাজার বছরের অর্জিত লোকপ্রজ্ঞার (Wisdom) এক জীবন্ত রূপ। একটি দেশকে গভীরভাবে জানা মানে কেবল তার ভৌগোলিক সীমান্ত চেনা নয়; বরং তার মাটির গন্ধ, অতীত সংগ্রাম, নদীর গতিপথ, মানুষের জীবনসংগ্রাম, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও বৈশ্বিক অবস্থানকে বোঝা। তাই বাংলাদেশ চর্চা কেবল একটি দেশের ইতিহাস জানার পাঠ নয়; এটি দেশপ্রেম, নাগরিক দায়িত্ববোধ, ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং এক সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক গভীর সাধনা।
ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো প্রথাগত ইতিহাসবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, প্রত্নতত্ত্ববিদ বা বাংলাদেশ বিষয়ের প্রাতিষ্ঠানিক গবেষক নই। তবে এই মাটির সন্তান ও একজন সচেতন অনুরাগী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে উপলব্ধি করেছি—আমাদের তরুণ প্রজন্মের মাঝে নিজ দেশকে গভীরভাবে জানা, মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস লালন করা এবং দেশের সম্ভাবনাকে অনুধাবন করার বিপুল আকুলতা রয়েছে। অভাব শুধু সেই সর্বজনীন ও সমৃদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক ডিজিটাল আঙিনার, যা তাদের দেশের ইতিহাস, স্বাধীনতা সংগ্রাম, সংস্কৃতি, সাহিত্য, ভূ-প্রকৃতি, শাসনব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক অর্জনকে বস্তুনিষ্ঠ ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে জানার সুযোগ করে দিতে পারে।
ঠিক এই চিন্তা থেকেই ‘বাংলাদেশ গুরুকুল’ (bangladesh.gurukul.edu.bd)-এর যাত্রা। আমি চাই, এখানে আমাদের তরুণেরা সুপ্রাচীন বাংলার ইতিহাস থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের সংবিধান, অর্থনীতি, পরিবেশ, লোকঐতিহ্য ও আধুনিক বাংলাদেশের উন্নয়ন-যাত্রার ইতিহাস সঠিকভাবে জানার ও অনুধাবন করার সুযোগ পাক। ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ সত্য, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি, টেকসই উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সম্ভাবনা—সবকিছুর পেছনের বিজ্ঞান ও দর্শন তারা যেন প্রাতিষ্ঠানিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে চর্চা করতে পারে, তেমনই একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
আজকের পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের তরুণেরা যদি নিজ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সম্ভাবনা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে পারে, তবে তারা কেবল দেশের অভ্যন্তরেই সুনাগরিক হিসেবে ভূমিকা রাখবে না; বরং বিশ্বমঞ্চেও বাংলাদেশের গৌরবময় ঐতিহ্য ও সম্ভাবনাকে মর্যাদার সাথে তুলে ধরতে সক্ষম হবে।
রাতারাতি একটি দেশের ইতিহাস চর্চা বা দেশভাবনার পুরো ক্যানভাস বদলে দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়, তা আমি জানি। তবে প্রতিটি ঐতিহাসিক সফরের পেছনে থাকে একটি ছোট শুরু। ‘বাংলাদেশ গুরুকুল’ সেই সুদীর্ঘ পথেরই এক বিনীত পদক্ষেপ—যেখানে বাংলাদেশ বিদ্যাকে দেখা হবে আত্মপরিচয়কে জানার, ইতিহাসের সঠিক শিক্ষা লালন করার এবং এক আত্মমর্যাদাশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণের মূল প্রেরণা হিসেবে।
তবে আগের মতোই একটি সত্য অকপটে স্বীকার করতে চাই—আমি হয়তো কেবল এই সুবিশাল উদ্যোগের সূচনাটুকু করলাম, কিন্তু একে কাঙ্ক্ষিত academic, বস্তুনিষ্ঠ ও প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া আমার একার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমার নিজের কাজের ক্ষেত্র ও আগ্রহের পরিধি অত্যন্ত বিচিত্র ও ছড়ানো-ছিটানো—যা আমার একটি বড় ব্যক্তিগত দুর্বলতা। নানামুখী ভাবনায় মন ছড়িয়ে থাকার কারণে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘদিন টানা পুরো মনোযোগ ধরে রাখা আমার একটা স্বভাবজাত সীমাবদ্ধতা। তাই কেবল আমাকে দিয়ে এই গভীর ও বহুমাত্রিক জাতীয় আয়োজন খুব বেশি দূর এগোতে পারবে না।
তাই দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, গবেষক, প্রত্নতত্ত্ববিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদদের প্রতি আমার সশ্রদ্ধ আহ্বান—আপনারা এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত হোন, এর শিক্ষাক্রম ও গবেষণায় দিকনির্দেশনা দিন এবং ‘বাংলাদেশ গুরুকুল’-কে নিজেদের প্রতিষ্ঠান ভেবে আপন করে নিন। আপনাদের প্রজ্ঞাবান দৃষ্টিভঙ্গি, অভিজ্ঞ হাত ও বস্তুনিষ্ঠ দিকনির্দেশনার আলোতেই এই স্বপ্ন পূর্ণতা পাক এবং কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে যাক।
— সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর
প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা,
বাংলাদেশ গুরুকুল